ঢাকা দক্ষিণে ফের পশুর হাট পেলেন আ.লীগ নেতারা

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসহ আশপাশের খালি জায়গায় বসবে পশুর হাট। ইজারাদার চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দরপত্র আহ্বানে মাত্র দুজন অংশ নেন। তবে শিডিউল কিনেছিলেন তিনজন। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছেন মো. মইন উদ্দিন চিশতী। তিনি ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা ছয়বার এই হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি।

পোস্তগোলার মতোই ডিএসসিসির ৯টি অস্থায়ী পশুহাটের ইজারা পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা। শিডিউল জমা না পড়ায় দুটি হাটের ইজারা এখনো হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি হাটের ইজারা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে হচ্ছে। গত কয়েক বছরের মতো এবারও প্রভাব খাটিয়ে হাট দখলে নিয়েছেন সরকারি দলের প্রভাবশালীরা। অনেকে দরপত্র কিনলেও জমা দেওয়ার সাহস পাননি। তবে দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, হাট ইজারার দরপত্রে যারা অংশ নেন, তাদের কাগজপত্রে রাজনৈতিক পরিচয় লেখা থাকে না। সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হয়। প্রতি বছরই হাটের মূল্য বাড়ছে।

এদিকে, গত কয়েক বছর দেখা গেছে কিছু হাটের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বারবার ইজারা পাচ্ছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডিএসসিসি এলাকায় পশুর হাটের ইজারাপ্রাপ্তদের তালিকায় দেখা গেছে, লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গায় পশুহাটের ইজারা পেয়েছেন মোহাম্মদ সালমান সেলিম আশিক। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি হাজী সেলিমের পুত্র। ঢাকা-৭ আসনের এমপি সোলায়মান সেলিম চারবার এ হাটের ইজারা পেয়েছিলেন। হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ৫০ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সালমান সেলিম ইজারা মূল্য দিয়েছেন ৬০ লাখ টাকা।

যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজ-সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গার জন্য এ বছর তিনটি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা দিয়েছেন শুধু আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান। তিনি স্থানীয় কাউন্সিলর, সংসদ সদস্য আর আওয়ামী লীগ নেতাদের

সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি। হাটটির সরকারি মূল্য ৪ কোটি ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। তিনি ইজারা মূল্য দিয়েছেনে ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা।

কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন খালি জায়গার হাটের ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম। হাটের সরকারি মূল্য ৬৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার বিপরীতে ইজারা হয়েছে ৬৮ লাখ টাকায়। এ হাটে ছয়টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েছে তিনটি। হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকায় পশুহাটের ইজারা পাচ্ছেন মুহাম্মদ আবুল হাসনাত। তিনি হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তিনটি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি। হাটটির সরকারি মূল্য ৩ কোটি ৩১ লাখ। ইজারা হয়েছে ৬ কোটি ৬ লাখ টাকায়।

ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন ৪১ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিট আওয়ামী লীগ সভাপতি আসফাক আজিম। তিনি ছাড়া আর কেউ শিডিউল ক্রয় করেননি। পুরান ঢাকার ৯ কাউন্সিলর আর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি তিনি। প্রতি বছরের মতো এবারও এই সিন্ডিকেট নির্ধারণ করে দিয়েছে কে পশুর হাটের ইজারা নেবে। ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডের উন্মুক্ত জায়গায় হাটের ইজারা দেওয়া হলেও এর পরিধি রায়সাহেব বাজার, দয়াগঞ্জ, মুরগিটোলা থেকে লোহারপুল এলাকাও ছাড়িয়ে যায়, যা ৯ কাউন্সিলরের এলাকার সীমানার মধ্যে পড়ে। আগে দুটি হাটের ইজারা স্থানীয় কাউন্সিলররা ভাগাভাগি করে নিতেন। এখন এই ৯ কাউন্সিলর ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা একটি হাট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইজারা নেন।

হাট ইজারার সঙ্গে আছেন স্থানীয় ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর ছেলে ইমতিয়াজ মন্নাফী, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রোকন উদ্দিন আহমেদ, ৪০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদ, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি সারোয়ার হোসেন, ৪২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ সেলিম, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফ হোসেন ছোটন, ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামসুজ্জোহা, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহিদউল্লাহ মিনু এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। হাটটি ইজারার সরকারি দর ছিল ৩ কোটি ৯১ লাখ, ইজারা হয়েছে ৪ কোটি ৩ লাখ টাকায়।

৪৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর আমি পশুর হাটের মধ্যে ছিলাম না। কিন্তু এ বছর ৯ কাউন্সিলর আর স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা মিলে হাট নিয়েছেন। ইজারাদার আমাদের ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সারোয়ার হোসেন আলোর বন্ধু।

আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গায় হাটের ইজারা পেয়েছেন এস এম নেওয়াজ সোহাগ। তিনিও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যুক্ত। সোহাগ ছাড়া আরেকজন দরপত্র কিনলেও জমা দেননি। মেরাদিয়া বাজার-সংলগ্ন খালি জায়গার ইজারা পেয়েছেন খিলগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবু সাঈদ। হাটটির সরকারি মূল্য ২ কোটি ৩৬ লাখ। ইজারা হয়েছে ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। এই হাটের ইজারা নিতে চারজন দরপত্র কিনলেও জমা দিয়েছেন দুজন।

উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘ ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গায় হাটের ইজারা পেয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর হামিদুল হক। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। এই হাটটি সাত বছর ধরে শাহজাহানপুর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল লতিফ ইজারা নেন। কিন্তু এ বছর তিনি হজে যাবেন বলে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে সাবেক কাউন্সিলরের নামে হাটের ইজারা নেওয়া হয়েছে। নামমাত্র দরপত্রে অংশ নেন আব্দুল লতিফ। তবে এই হাটটি বরাবরের মতো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে নিশ্চিত করেছেন আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, হজে যাওয়ার কারণে এ বছর হাটটি নিজের নামে নেওয়া হয়নি।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ডিএসসিসি ১১টি কোরবানির পশুর হাটের ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেয় গত ৪ এপ্রিল। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার প্রথম পর্যায়ের দর আহ্বান হয়েছিল। এতে ৯টি হাটের ইজারার উন্মুক্ত দরপত্র করা হয়। বাকি দুটি হাটের মধ্যে লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব-সংলগ্ন খালি জায়গাসহ কমলাপুর স্টেডিয়াম-সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গায় কেউ কোনো শিডিউল কেনেননি। তবে এ হাটটি বরাবরের মতো ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ভাট্টি নিয়ন্ত্রণ করেন। গত বছরও প্রথম পর্যায়ে এই হাট ইজারা নিতে কেউ দরপত্র কেনেননি। আর আফতাবনগর খালি জায়গায় দুটি শিডিউল বিক্রি হলেও কেউ জমা দেননি। আগামী ১৩ ও ২৮ মে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের দরপত্র আহ্বান করা হবে।

কোরবানি পশুর হাট বরাবরের মতো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে কি না—এমন প্রশ্নে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী কালবেলাকে বলেন, ‘দরপত্র আবেদন প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করে দিয়েছি। শিডিউল বিক্রি হয়েছে সংখ্যায় বেশি। তবে সবাই দরপত্র জমা দেননি। এটি প্রথম পর্যায়। আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখবে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়েও দরপত্র নেওয়া হবে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

কাঁচামালের সংকটে ২৫ দিন বন্ধ থাকতে পারে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার এনামুল হক রাশেদীঃ বর্তমানে ইআরএলে ব্যবহারযোগ্য অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে প্রায় ২০ হাজার টন। মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসায় উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন জ্বালানি উৎপাদন হলেও এখন তা কমে ৩ হাজার ২০০ টনে নেমে এসেছে। কাঁচামালের সংকটে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বন্ধ থাকায় আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে রিফাইনারিটির মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে। ফলে অন্তত ২৫ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠার ৫৭ বছরের ইতিহাসে কাঁচামালের অভাবে এমন পরিস্থিতি এবারই প্রথম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত ৩৫ দিনে অপরিশোধিত তেলবাহী কোনো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়নি। বর্তমানে ইআরএলে ব্যবহারযোগ্য অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে প্রায় ২০ হাজার টন। মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসায় উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন জ্বালানি উৎপাদন হলেও এখন তা কমে ৩ হাজার ২০০ টনে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, চলতি মাসে নতুন কোনো অপরিশোধিত তেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার সম্ভাবনা নেই। পরবর্তী চালানটি আসতে পারে আগামী ১ মে। এক লাখ টন তেলবাহী সেই জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে রিফাইনারিতে তেল আনতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। এ হিসাবে অন্তত ২৫ দিন ইআরএলের উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের এই রিফাইনারি মাসে প্রায় দেড় লাখ টন তেল পরিশোধন করে। এখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ হাজার টন পেট্রোলসহ মোট ১৪ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন হয়। দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল, যা মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলছে বিপিসি জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিপিসি। জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ইআরএল সাময়িক বন্ধ হলেও দেশে অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট হবে না। বর্তমানে অন্তত তিন মাস চলার মতো অকটেন মজুত রয়েছে। তিনি জানান, যুদ্ধ শুরুর পর অপরিশোধিত তেল না এলেও ইতোমধ্যে ১০টি জাহাজে ডিজেল দেশে এসেছে। এপ্রিল মাসে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল আসা নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের ডিপোগুলোতে মজুত রয়েছে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং আরও প্রায় ৬০ হাজার টন আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। পেট্রোল-অকটেনের মজুত স্বাভাবিকঃ দেশে মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টন অকটেন ও ৩০ হাজার টনের কিছু বেশি পেট্রোলের চাহিদা রয়েছে। সিলেট গ্যাসফিল্ডের কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্লান্টসহ কয়েকটি বেসরকারি প্লান্ট থেকে পেট্রোল উৎপাদন হওয়ায় এ খাতে তেমন সংকট নেই। সম্প্রতি ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে এবং আরও একটি জাহাজ আগামী সপ্তাহে আসার কথা রয়েছে। তবে ইআরএল বন্ধ হয়ে গেলে ন্যাফথা সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ পেট্রোল ও অকটেন মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় এই উপাদানটি গুরুত্বপূর্ণ। মে মাসে আসতে পারে অপরিশোধিত তেল বিপিসি সূত্র জানায়, সৌদি আরবের ইয়ানবু কমার্শিয়াল পোর্ট থেকে ২০ এপ্রিল এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা হবে। এছাড়া ‘এমটি নরডিক পলুকস’ নামের আরেকটি জাহাজে এক লাখ টন তেল হরমুজ প্রণালিতে আটকে রয়েছে। দুটি জাহাজ মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল মে মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তেল খালাস করে রিফাইনারিতে পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগবে। এরপর গুণগত মান যাচাই শেষে পুনরায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু করা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দেশে জ্বালানির ব্যবহারঃ বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে। মোট ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশই এই খাতে ব্যয় হয়। এছাড়া কৃষিতে ১৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১২ শতাংশ, শিল্পে প্রায় ৬ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে বাকি জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬৮ লাখের বেশি টন জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ডিজেল—৪৩ লাখ টনেরও বেশি, যা মোট বিক্রির প্রায় ৬৪ শতাংশ।

ঢাকার মিরপুরের আভিজাত রেস্টুরেন্টে এসইবিডি বৈশাখী উৎসব ১৪৩৩ ও উদ্যোক্তা মিটআপ ২০২৬ অনুষ্ঠিত:

ঢাকা দক্ষিণে ফের পশুর হাট পেলেন আ.লীগ নেতারা

Update Time : ০২:১৯:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ মে ২০২৪

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসহ আশপাশের খালি জায়গায় বসবে পশুর হাট। ইজারাদার চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দরপত্র আহ্বানে মাত্র দুজন অংশ নেন। তবে শিডিউল কিনেছিলেন তিনজন। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছেন মো. মইন উদ্দিন চিশতী। তিনি ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা ছয়বার এই হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি।

পোস্তগোলার মতোই ডিএসসিসির ৯টি অস্থায়ী পশুহাটের ইজারা পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা। শিডিউল জমা না পড়ায় দুটি হাটের ইজারা এখনো হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি হাটের ইজারা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে হচ্ছে। গত কয়েক বছরের মতো এবারও প্রভাব খাটিয়ে হাট দখলে নিয়েছেন সরকারি দলের প্রভাবশালীরা। অনেকে দরপত্র কিনলেও জমা দেওয়ার সাহস পাননি। তবে দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, হাট ইজারার দরপত্রে যারা অংশ নেন, তাদের কাগজপত্রে রাজনৈতিক পরিচয় লেখা থাকে না। সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হয়। প্রতি বছরই হাটের মূল্য বাড়ছে।

এদিকে, গত কয়েক বছর দেখা গেছে কিছু হাটের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বারবার ইজারা পাচ্ছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডিএসসিসি এলাকায় পশুর হাটের ইজারাপ্রাপ্তদের তালিকায় দেখা গেছে, লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গায় পশুহাটের ইজারা পেয়েছেন মোহাম্মদ সালমান সেলিম আশিক। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি হাজী সেলিমের পুত্র। ঢাকা-৭ আসনের এমপি সোলায়মান সেলিম চারবার এ হাটের ইজারা পেয়েছিলেন। হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ৫০ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সালমান সেলিম ইজারা মূল্য দিয়েছেন ৬০ লাখ টাকা।

যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজ-সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গার জন্য এ বছর তিনটি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা দিয়েছেন শুধু আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান। তিনি স্থানীয় কাউন্সিলর, সংসদ সদস্য আর আওয়ামী লীগ নেতাদের

সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি। হাটটির সরকারি মূল্য ৪ কোটি ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। তিনি ইজারা মূল্য দিয়েছেনে ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা।

কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন খালি জায়গার হাটের ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম। হাটের সরকারি মূল্য ৬৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার বিপরীতে ইজারা হয়েছে ৬৮ লাখ টাকায়। এ হাটে ছয়টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েছে তিনটি। হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকায় পশুহাটের ইজারা পাচ্ছেন মুহাম্মদ আবুল হাসনাত। তিনি হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তিনটি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি। হাটটির সরকারি মূল্য ৩ কোটি ৩১ লাখ। ইজারা হয়েছে ৬ কোটি ৬ লাখ টাকায়।

ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন ৪১ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিট আওয়ামী লীগ সভাপতি আসফাক আজিম। তিনি ছাড়া আর কেউ শিডিউল ক্রয় করেননি। পুরান ঢাকার ৯ কাউন্সিলর আর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি তিনি। প্রতি বছরের মতো এবারও এই সিন্ডিকেট নির্ধারণ করে দিয়েছে কে পশুর হাটের ইজারা নেবে। ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডের উন্মুক্ত জায়গায় হাটের ইজারা দেওয়া হলেও এর পরিধি রায়সাহেব বাজার, দয়াগঞ্জ, মুরগিটোলা থেকে লোহারপুল এলাকাও ছাড়িয়ে যায়, যা ৯ কাউন্সিলরের এলাকার সীমানার মধ্যে পড়ে। আগে দুটি হাটের ইজারা স্থানীয় কাউন্সিলররা ভাগাভাগি করে নিতেন। এখন এই ৯ কাউন্সিলর ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা একটি হাট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইজারা নেন।

হাট ইজারার সঙ্গে আছেন স্থানীয় ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর ছেলে ইমতিয়াজ মন্নাফী, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রোকন উদ্দিন আহমেদ, ৪০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদ, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি সারোয়ার হোসেন, ৪২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ সেলিম, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফ হোসেন ছোটন, ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামসুজ্জোহা, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহিদউল্লাহ মিনু এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। হাটটি ইজারার সরকারি দর ছিল ৩ কোটি ৯১ লাখ, ইজারা হয়েছে ৪ কোটি ৩ লাখ টাকায়।

৪৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর আমি পশুর হাটের মধ্যে ছিলাম না। কিন্তু এ বছর ৯ কাউন্সিলর আর স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা মিলে হাট নিয়েছেন। ইজারাদার আমাদের ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সারোয়ার হোসেন আলোর বন্ধু।

আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গায় হাটের ইজারা পেয়েছেন এস এম নেওয়াজ সোহাগ। তিনিও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যুক্ত। সোহাগ ছাড়া আরেকজন দরপত্র কিনলেও জমা দেননি। মেরাদিয়া বাজার-সংলগ্ন খালি জায়গার ইজারা পেয়েছেন খিলগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবু সাঈদ। হাটটির সরকারি মূল্য ২ কোটি ৩৬ লাখ। ইজারা হয়েছে ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। এই হাটের ইজারা নিতে চারজন দরপত্র কিনলেও জমা দিয়েছেন দুজন।

উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘ ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গায় হাটের ইজারা পেয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর হামিদুল হক। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। এই হাটটি সাত বছর ধরে শাহজাহানপুর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল লতিফ ইজারা নেন। কিন্তু এ বছর তিনি হজে যাবেন বলে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে সাবেক কাউন্সিলরের নামে হাটের ইজারা নেওয়া হয়েছে। নামমাত্র দরপত্রে অংশ নেন আব্দুল লতিফ। তবে এই হাটটি বরাবরের মতো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে নিশ্চিত করেছেন আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, হজে যাওয়ার কারণে এ বছর হাটটি নিজের নামে নেওয়া হয়নি।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ডিএসসিসি ১১টি কোরবানির পশুর হাটের ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেয় গত ৪ এপ্রিল। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার প্রথম পর্যায়ের দর আহ্বান হয়েছিল। এতে ৯টি হাটের ইজারার উন্মুক্ত দরপত্র করা হয়। বাকি দুটি হাটের মধ্যে লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব-সংলগ্ন খালি জায়গাসহ কমলাপুর স্টেডিয়াম-সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গায় কেউ কোনো শিডিউল কেনেননি। তবে এ হাটটি বরাবরের মতো ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ভাট্টি নিয়ন্ত্রণ করেন। গত বছরও প্রথম পর্যায়ে এই হাট ইজারা নিতে কেউ দরপত্র কেনেননি। আর আফতাবনগর খালি জায়গায় দুটি শিডিউল বিক্রি হলেও কেউ জমা দেননি। আগামী ১৩ ও ২৮ মে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের দরপত্র আহ্বান করা হবে।

কোরবানি পশুর হাট বরাবরের মতো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে কি না—এমন প্রশ্নে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী কালবেলাকে বলেন, ‘দরপত্র আবেদন প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করে দিয়েছি। শিডিউল বিক্রি হয়েছে সংখ্যায় বেশি। তবে সবাই দরপত্র জমা দেননি। এটি প্রথম পর্যায়। আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখবে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়েও দরপত্র নেওয়া হবে।’